এক দেশে শ্রম অভিবাসনের অতিনির্ভরতা: টেকসই নয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স।
অনলাইন ডেস্ক, বাংলাদেশ - Saturday, October 11, 2025 38
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। প্রতিবছর দেড় কোটির বেশি প্রবাসী কর্মীর পরিশ্রমে দেশে আসে ২০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একটি গভীর উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে—বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন ক্রমেই একটি মাত্র গন্তব্যের ওপর বিপজ্জনকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট শ্রমিকের ৬৭ শতাংশই গেছেন সৌদি আরবে। যদিও সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার, তবে এত বেশি কেন্দ্রীভূত নির্ভরতা আগে কখনো দেখা যায়নি। এই প্রবণতা স্বল্পমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অটেকসই।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা অমূলক নয়। সৌদি আরবে বর্তমানে যে শ্রমিক চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার বড় অংশই অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পনির্ভর—বিশেষ করে ফিফা বিশ্বকাপ ২০৩৪ আয়োজনকে সামনে রেখে। এসব প্রকল্প শেষ হলে স্বল্পদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হঠাৎ করেই কমে যেতে পারে। তখন বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের রেমিট্যান্স ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।
অন্যদিকে, শ্রম অভিবাসনের গুণগত উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা থাকলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। সরকার পরিচালিত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের খুব কম অংশই বিদেশে কাজে যাচ্ছেন। এটি একদিকে দক্ষতার সঙ্গে বৈশ্বিক চাহিদার অসামঞ্জস্য, অন্যদিকে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
নারী শ্রম অভিবাসনের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বৈশ্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবা, কেয়ারগিভিং ও নার্সিং খাতে নারীদের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ এখনও প্রধানত গৃহকর্মী কিংবা স্বল্পদক্ষ পোশাকশ্রমিক হিসেবেই নারী কর্মী পাঠাচ্ছে। এতে একদিকে আয় সীমিত হচ্ছে, অন্যদিকে নারী শ্রমিকদের ঝুঁকি ও শোষণের আশঙ্কা বাড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী আগেভাগেই দেশে ফিরে আসলেও তাদের বিষয়ে কোনো সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে ফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন, দক্ষতা পুনঃব্যবহার কিংবা সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। নীতিনির্ধারণেও এই তথ্যশূন্যতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি মহলে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, হঠাৎ করে দক্ষ অভিবাসনে রূপান্তর সম্ভব নয়। কথাটি বাস্তবসম্মত হলেও এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত স্থবিরতার ব্যাখ্যা হতে পারে না। দক্ষ শ্রমশক্তি তৈরি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যা আজ না শুরু করলে আগামীকালও ফল পাওয়া যাবে না।
অভিবাসন খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। যেখানে বৈশ্বিক শ্রমবাজার দ্রুত রূপান্তরিত হচ্ছে, সেখানে বাজেট সংকোচন এই খাতের আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্যকরণকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন স্পষ্ট একটি বার্তা রয়েছে: শ্রম অভিবাসন শুধু সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়, এটি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক খাত। একক দেশের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে গন্তব্য ও দক্ষতার বৈচিত্র্য আনা জরুরি। একই সঙ্গে অভিবাসন শাসনব্যবস্থার সংস্কার, স্বচ্ছ নিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
রেমিট্যান্সের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে শ্রম অভিবাসনের ভবিষ্যৎকে এখনই নতুনভাবে ভাবতে হবে। নতুবা আজকের লাভ আগামী দিনের ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
Recent Comments (0)