মধ্য প্রাচ্যে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী শ্রমিকদের সংকট ও সমাধানের পথ
১৯৭০-এর দশকের তেল উত্তোলন ও অর্থনৈতিক বিকাশের পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—দক্ষিণ এশিয়ার লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
অনলাইন ডেস্ক, বাংলাদেশ - Saturday, October 11, 2025 26
১৯৭০-এর দশকের তেল উত্তোলন ও অর্থনৈতিক বিকাশের পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো—বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—দক্ষিণ এশিয়ার লক্ষ লক্ষ অভিবাসী শ্রমিকের কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তবে কোভিড-১৯ মহামারী "কাফালা ব্যবস্থা"-র অধীনে এই শ্রমিকদের চরম ঝুঁকি ও নিপীড়ন উন্মোচিত করেছে। গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশীয় শ্রমিক পাঠানো দেশগুলোর একটি আঞ্চলিক জোট গঠন জরুরি হয়ে পড়েছে।
কাফালা ব্যবস্থা কি?
কাফালা হল একটি স্পন্সরশিপ পদ্ধতি, যেখানে শ্রমিকের আইনি অবস্থা, কাজ ও থাকার অনুমতি সম্পূর্ণরূপে নিয়োগকর্তার (কাফিল) হাতে ন্যস্ত। এই ব্যবস্থায়:
শ্রমিকরা কাজ পরিবর্তন করতে পারে না।
নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়া দেশ ত্যাগ করতে পারে না।
মজুরি না দেওয়া, পাসপোর্ট জব্দ, অস্বাস্থ্যকর বসবাসের মতো ঘটনা নিয়মিত হয়।
মহামারীতে শ্রমিকদের কী হয়েছিল?
২০২০ সালে কোভিড-১৯ এর সময় উপসাগরীয় দেশগুলোতে:
লকডাউনে শ্রমিকরা বেতন হারায়, বাসস্থানে আটকা পড়ে।
স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
অনেককে ছাঁটাই করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পায় (প্রায় ২২%)।
সারণি-১ দেখায়, ২০২০ সালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া থেকে শ্রমিক প্রেরণ ৫৮.৪৪% কমেছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর কিছু সংস্কার
কিছু উপসাগরীয় দেশ সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে:
কাতার: ২০১৭ সালে "এক্সিট পারমিট" বাতিল করেছে, ২০২০ সালে সর্বনিম্ন মজুরি চালু করেছে।
সৌদি আরব: ২০২১ সালে কিছু শ্রমিকের জন্য নিয়োগকর্তার অনুমতি ছাড়াই চাকরি পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: দক্ষ শ্রমিকদের জন্য "সেলফ-স্পন্সরশিপ" চালু করেছে।
তবে এই সংস্কারগুলো সীমিত ও অসম্পূর্ণ—বিশেষত গৃহকর্মী ও কৃষি শ্রমিকরা এর আওতার বাইরে রয়ে গেছে।
গবেষণাটি প্রস্তাব করে যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে একটি আঞ্চলিক জোট গঠন করতে হবে—South Asian Migrant Workers’ Support Alliance (SAMWSA)। এই জোটের লক্ষ্য হবে:
সম্মিলিতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে দরকষাকষি করা।
শ্রমিকদের মজুরি সুরক্ষা, স্বাস্থ্যবিমা, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করা।
কোভিড-১৯-এর মতো সংকটে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের "ব্লু কার্ড" ব্যবস্থা, আফ্রিকার ECOWAS ভিসা নীতিমালা, এবং ASEAN-এর অভিবাসন চুক্তি থেকে দক্ষিণ এশিয়া শেখার সুযোগ আছে।
চ্যালেঞ্জ
উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের অভ্যন্তরীণ শ্রম বাজার নিয়ন্ত্রণে সরাসরি হস্তক্ষেপ পছন্দ করে না।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জটিল।
শ্রমিক পাঠানোর প্রতিযোগিতাও একটি বাধা।
মধ্য প্রাচ্যে দক্ষিণ এশিয়ার লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। কোভিড-১৯ এই সত্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো যদি একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট গঠন করে, তাহলে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল অভিবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র: Amnesty International (2020), ILO (2020), World Bank (2020), Human Rights Watch (2020), এবং বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান।
Recent Comments (0)