জিএমসি অভিযোগ
স্থানীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো শক্তিশালী না হলে ন্যায্য অভিবাসন সম্ভব নয়
বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থা আজও বহু ক্ষেত্রে প্রতারণা, অনিয়ম ও তথ্য ঘাটতির শিকার। বিদেশে কাজের স্বপ্ন দেখিয়ে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা বছরের পর বছর ধরে অভিবাসী ও তাদের পরিবারকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে আসছে। এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—প্রতারণার শিকার একজন অভিবাসী বা তার পরিবার কোথায় যাবে, কার কাছে ন্যায়বিচার চাইবে?
রাষ্ট্রীয় কাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, অনেক অভিবাসী অভিযোগ জানাতে ভয় পান বা জানেনই না কোন পথে গেলে সমাধান পাওয়া সম্ভব। এই জায়গাটিতেই স্থানীয় পর্যায়ে গঠিত Grievance Management Committee (GMC) একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করছে।
চট্টগ্রামের ডুলাহাজারা ইউনিয়নে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি অভিবাসন বিরোধ নিষ্পত্তি বৈঠক সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা নারী, আমেনা খাতুন, যিনি ভুয়া ভিসা প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানোর পথে ছিলেন—স্থানীয় GMC–এর হস্তক্ষেপে তিনি অন্তত আংশিক ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এই ঘটনা কেবল একটি ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি দেখায়, স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার কতটা কার্যকর হতে পারে।
২০২৫ সালে সারাদেশে GMC–এর মাধ্যমে প্রায় ৩৭ লাখ টাকা উদ্ধার হওয়া প্রমাণ করে যে এই কাঠামো কোনো পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়; বরং এটি একটি কার্যকর grievance redress system। তবুও দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই কমিটিগুলো এখনো পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি, জনবল ও নীতিগত সহায়তা পায় না।
অভিবাসন একটি বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। এখানে শুধু বিদেশ পাঠানো নয়, প্রতারণা প্রতিরোধ, ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ইউনিয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ে GMC–গুলোকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, নির্দিষ্ট কার্যপরিধি নির্ধারণ করা এবং BMET, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিবাসীদের তথ্যপ্রাপ্তি। যদি অভিবাসীরা জানেন যে ইউনিয়ন পর্যায়েই অভিযোগ জানানো সম্ভব, তাহলে অনেক প্রতারণাই হয়তো শুরুতেই থেমে যাবে। তাই প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ, ইউনিয়ন পরিষদ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে GMC–সংক্রান্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
ন্যায্য ও নিরাপদ অভিবাসন কেবল বিদেশে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করলেই হয় না; প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত ও সম্মানজনক সমাধান নিশ্চিত করাও এর অংশ। স্থানীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামোকে শক্তিশালী করা মানেই অভিবাসীর আস্থা পুনর্গঠন করা।
অভিবাসীদের বাদ দিয়ে অভিবাসন নীতি কখনোই কার্যকর হতে পারে না।
ন্যায্য অভিবাসন নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ের এই কার্যকর উদ্যোগগুলোকে এখনই জাতীয় নীতির অংশ করতে হবে।